'প্রেম ছাড়া মানুষ নেই, আমিও সবার  সাথেই প্রেম করেছি'

By: বাবু 2018-05-10 17:06:14 স্পেশাল

বিনোদন প্রতিবেদক: পুরান ঢাকায়  ঢাকায় কেটেছে তার শৈশব কেটেছে তার পুরান ঢাকায়। ছোট বেলা থেকেই বেশ ডানপিটে স্বভাবের ছিলেন তিনি। ১৯৬৬ সালে তিনি ছয় দফা আন্দোলনে যোগ দেন এবং সেসময়ে তার নামে প্রায় ৩৭টি মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। তারপর নানা চড়াই উৎরাই পার করে রুপালী পর্দার হয়ে জয় করে নেন লাখো ভক্তদের মন। বলছি বাংলা চলচ্চিত্রের সবার প্রিয় মিঞা ভাই খ্যাত নায়ক ফারুকের কথা। আসল নাম আকবর হোসেন পাঠান দুলু  হলেও তিনি মিয়া ভাই, দুলু গূণ্ডা সহ নানা খ্যাতাপ পেয়েছেন। 

চলচ্চিত্রে তার অভিষেক ১৯৭১ সালে  এইচ আকবর পরিচালিত জলছবি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে।   এরপর একের পর এক হিট ছবি দিয়ে জায়গা করে নেন বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মন। বাংলা চলচ্চিত্রের এই শক্তিমান অভিনেতা  সাথে বাংলা প্রতিদিনের কথা হলো। জানালেন তার চলচ্চিত্র জীবন নিয়ে নানা কথা সহ তার শৈশবের নানা মজার ঘটনা। 

শুরুতেই তার শৈশব নিয়ে জানতে চাইলে এই অভিনেতা বলেন, ' আমাদের শৈশবটা ছিল বেশ মজার। বেশ ডানপিটে স্বভাবের ছিলাম। এখন এখানে তো একটু পর অন্য জায়গায়। সারাক্ষন ছুটোছুটি করতেই থাকতাম। এলাকায় আমি এতটাই ডানপিটে স্বভাবের ছিলাম যে  একসময় পুরান ঢাকার মানুষ আমাকে ভয় পেত। সবাই আমাকে দুলু গুণ্ডা নামে চিনত।'

বাংলা প্রতিদিন:  অভিনয়ের শুরুটা কিভাবে?

ফারুক:  নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। এলাকায় কোনো নাটক হলে  তা নষ্ট করে দিতাম। দেখা গেল, নাটক শুরু হয়েছে আর আমি পাশে দাঁড়িয়ে পচা ডিম মারছি। ভয়ে আমাকে কেউ কিছু বলতেও পারত না।  তবে এক সময় নাটকের সবাই আমার কাছে চলে আসতেন এবং তাঁদের দলে কাজ করতে বলতেন। এক পর্যায় আমাকে নাটকে নিতে বাধ্য হয় নাটকের লোকজন।  প্রথম দিকে  নাটক শুরু হওয়ার আগে ও পরে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হতো গেটে। যাঁরা অনুষ্ঠান দেখতে আসতেন, তখন আমি গেটে দাঁড়িয়ে সবাইকে স্বাগত জানাতাম। পরে এক দিন হুট করেই নাটকের একজন তাদের অনুশীলনে আসেনি তারপর সেই জায়গাতেই আমাকে বারবার অনুরোধ করে একটু সাহায্য করার জন্য। আমিও এত অনুরোধের পর একদিন করলাম, ধুদিন করলাম। এরপর আমাকেই মঞ্চে দাড় করিয়ে দেন ফায়নাল নাটক প্রদর্শনের দিন। তবে তাদের এই সব কিছুর পেছেনেই উদ্দেশ্য ছিলো যে আমি যদি নাটকে কাজ করি তাদের সাথে তাহলে তার তাদের কাজ করতে ঝামেলা হবে না।  

 বাংলা প্রতিদিন:  চলচ্চিত্রে যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাই? 

ফারুক : চলচ্চিত্রে আমি আসলে এসেছি আশ্রয় নেওয়ার জন্য। কারণ, ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলন যখন শুরু হয়, তখন আমি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত। আমার নামে ৩৭টি মামলা, সে সময় আমার কাছের বন্ধুরা আমাকে বুদ্ধি দেয়, আমি যেন চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করি, তাহলে মামলা থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাব। তখন আমাকে পরিচালক এইচ আকবর সাহেব নবাবপুর রোডে একটি হোটেলে নিয়ে যান এবং আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন সবার সঙ্গে। আমার নাম বদল করা হয়, নতুন নাম দেওয়া হয় ফারুক। প্রথম ছবির নাম আমার মনে নেই। তবে প্রথম মুক্তি পাওয়া ছবিটি ছিল ‘জলছবি’।'

বাংলা প্রতিদিন: বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে আপনি অনেক নায়িকার সাথে অভিনয় করেছেন। কোন নায়িকার সাথে আপনি কাজ করতে বেশি সাচ্ছদ্য বোধ করেছেন?  

ফারুক: আমি জুটি শব্দটিতে বিশ্বাসী নই। আমি আমার চলচ্চিত্র জীবনে শবনম থেকে শুরু করে মৌসুমি পর্যন্ত প্রায় সব নায়িকার সাথেই কাজ করেছি। সবার সাথে অভিনয় করতে ভালো লেগেছে।  

বাংলা প্রতিদিন: আপানার জীবনের প্রেম নিয়ে কিছু বলেন?  

ফারুক:  প্রেম ছাড়া মানুষ হয়না। আর আমার যারা শিল্পী তাদের প্রেম আরো বেশী। একটি ছবির শুটিং হয় তখন তা যদি তিন শিফটে তাহলে সে তিনবারই প্রেমে পড়ে। আর যারা বলে আমি প্রেমে পড়িনি তারা মিথ্যা বলে। অভিনয় করতে হলে একজন নায়কের বা নায়িকার অব্যশই তার কো আর্টিস্টের প্রেমে পরতেই হবে না হলে সে অভিনেতা হবে না। আমিও সবার সাথেই প্রেম করেছি। 

বাংলা প্রতিদিন:  নায়িকা ববিতাকে সাথে আপনাকে নিয়ে বেশ গুঞ্জন শোনা যেতো বিষয়টা কতটুকু সত্য? 

ফারুক: ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই এই গুঞ্জন ছিল এখনো আছে যার পিছু ছাড়েনি চলচ্চিত্র পুরস্কার পর্যন্ত। আর শিল্পী হলে গুঞ্জন থাকবেই। 

বাংলা প্রতিদিন: চলচ্চিত্র থেকে  প্রাপ্তি?  

ফারুক: আমি যা পেয়েছি, তার পুরোটাই চলচ্চিত্র থেকে। দেশের প্রয়োজনে রাজনীতি করেছি। আমার মনের ভালো লাগা থেকে চলচ্চিত্র করেছি। আমার প্রথম ছবিটি মুক্তি পায় মুক্তিযুদ্ধের সময়। তখন আর সিনেমা হলের খবর নেওয়ার সময় ছিল না। চারদিকে যুদ্ধ, আর আমরা মুক্তিযোদ্ধা। টানা নয় মাস যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলাম। আবার শুরু হলো চলচ্চিত্রে কাজ, তাও কিন্তু যুদ্ধের ছবি দিয়ে। ছবির নাম ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ও ‘আলোর মিছিল’। তারপর থেকে আমি চলচ্চিত্রেই নিজের জীবন খুঁজে পেলাম। যদিও মামলা থেকে রেহাই পেতে আমি চলচ্চিত্রে এসেছিলাম। কিন্তু আসার পর মনে হয়েছে, আমরা জন্ম বোধ হয় এটির জন্যই হয়েছিল। নাওয়া-খাওয়া ভুলে শুধুই চলচ্চিত্রের জন্য কাজ করে গেছি। 

বাংলা প্রতিদিন: জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার নিয়ে আপনার মতামত কি?  

ফারুক: দীর্ঘ চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে আমাকে ১৯ বার সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দিতে গিয়েও বাদ দেয়া হয়েছে। আমার অপরাধ ছিল আমি বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি করি। তাই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই’।


কিংবদন্তি এই অভিনেতা তার  উজ্জল ক্যারিয়ারে তিনি চলচ্চিত্রে লাঠিয়াল, সুজন সখী, নয়নমনি, সারেং বৌ, গোলাপী এখন ট্রেনে, সাহেব, আলোর মিছিল, দিন যায় কথা থাকে, মিয়া ভাইসহ অসংখ্য ব্যবসা সফল ছবি উপহার দিয়েছেন। শুধু মাত্র ১৯৭৫ সালে অভিনয়ের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘লাঠিয়াল’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার ছাড়া আর কোনো পুরস্কার পাননি এ গুনী অভিনেতা।