খলনায়ক সংকটে ঢালিউড

By: 2018-03-27 16:52:37 স্পেশাল

বিনোদন প্রতিবেদক : ঢাকাই চলচ্চিত্রে খলনায়কের সংকট চলছে। সোনালি যুগের পর্দা কাঁপানো খলনায়কদের অনেকেই এখন চলচ্চিত্র থেকে দূরে রয়েছেন। এদের তালিকায় রয়েছেন- এটিএম শামসুজ্জামান, আহমেদ শরীফ, মনোয়ার হোসেন ডিপজল প্রমুখ। এদিকে, নতুন করে কোনো যোগ্য খলনায়কের আবির্ভাব ঘটছে না। তরুণ প্রজন্মের গুটিকয়েক খল-অভিনেতা দু-একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে প্রশংসিত হলেও শক্ত করে নিজের আসনটি ধরে রাখতে পারছেন না। এ তালিকায় আছেন-ডিজে সোহেল, শিমুল খান, তাসকিন, জিয়া ভিমরুল, জুয়েল প্রমুখ।


মূলত খলনায়করাই গল্পকে শ্বাসরুদ্ধকরভাবে এগিয়ে নেয়াসহ ছবিতে গতি এনে দেয়। সব মিলিয়ে দর্শক গ্রহণযোগ্য ছবি তৈরিতে খলনায়করাই মূখ্য ভূমিকা পালন করেন। তাই নায়কের চেয়ে খলনায়কের গুরুত্ব মোটেও কম নয়। কারণ, খলনায়কের কাজ হচ্ছে গল্পে ব্যঞ্জনা তৈরি করা। অভিনয়ের প্রয়োজনে এদের চলচ্চিত্রের পর্দায় বিচিত্র রূপ ধারণের পাশাপাশি কঠিন কঠিন কাজ করতে হয়। তাই চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, খলচরিত্রে অভিনয় করতে হলে দক্ষ অভিনয়শিল্পী হওয়া আবশ্যক।

বিশিষ্ট খল ও কমেডি অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান একাধারে অভিনেতা, গল্পকার, চিত্রনাট্যকার ও নির্মাতা। ১৯৭২ সালে নারায়ণ ঘোষ মিতার 'নীল আকাশের নীচে' ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেন। এরপর ১৯৭৭ সালে আমজাদ হোসেনের 'নয়নমণি' ছবিতে খলনায়ক হয়ে অভিনয় করেন। অতঃপর খলনায়ক হিসেবে 'গোলাপী এখন ট্রেনে', 'সূর্য দীঘল বাড়ী', 'অশিক্ষিত'সহ আরো অনেক জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করেছেন এবং পুরস্কৃত হয়েছেন। একসময় অবশ্য মন্দ মানুষের চরিত্রের পাশাপাশি কৌতুক অভিনেতা হিসেবেও তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। ২০০৮ সালে 'এবাদত' নামে একটি ছবি পরিচালনা করে আলোচনায় আসেন। এখন তিনি চলচ্চিত্র থেকে অনেকটা দূরে রয়েছেন। তবে ছোটপর্দায় সরব আছেন।


ঢাকাই চলচ্চিত্রের শক্তিমান অভিনেতা আহমেদ শরীফ। সর্বপ্রথম তিনি ১৯৭২ সালে নজরুল ইসলামের 'স্বরলিপি' ছবিতে অভিনয় করেন। এরপর খল-অভিনেতা হিসেবে নিজেকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যান। 'ডাকু মনসুর', 'রাজদুলালী', 'মহেশখালীর বাঁকে', 'রূপালী সৈকতে', 'রাজমহল'সহ প্রায় চার শতাধিক ছবিতে খলচরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। অনবদ্য অভিনয়ের স্বীকৃতি স্বরূপ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচসাসসহ নানা সংগঠনের অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন। তবে বর্তমানে তাকে চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাচ্ছে না। জানা গেছে, ব্যক্তিগত কারণেই তিনি চলচ্চিত্র থেকে দূরে রয়েছেন। 


বহুল আলোচিত-সমালোচিত খল-অভিনেতা মনোয়ার হোসেন ডিপজল ১৯৯২ সালে মনতাজুর রহমান আকবরের 'টাকার পাহাড়' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে খলনায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রে পদার্পণ করেন। স্বল্প সময়ের মধ্যে চলচ্চিত্রের মন্দলোক হিসেবে খ্যাতি পান তিনি। তার মুখের প্রতিটি সংলাপই এক সময় দর্শকের মুখে মুখে শোনা যেত। খলনায়ক চরিত্রে প্রায় একশর কাছাকাছি ছবিতে অভিনয় করেছেন ডিপজল। তবে এ অভিনেতাকে এখন আর চলচ্চিত্রের পর্দায় সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। কিছুদিন আগে তিনি কয়েকটি ছবি নির্মাণেরও ঘোষণা দিয়েছিলেন। বর্তমানে সেসব ছবির কাজ থমকে আছে।


খল-অভিনেতা ডন ১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহানের 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত' ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেন। এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। তবে বর্তমানে তিনি চলচ্চিত্রে আগের মতো নিয়মিত নন। সম্প্রতি তিনি একটি ব্যান্ডদল গঠন করেছেন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত কাজ-কর্ম করেই তার সময় কাটছে।


এটিএম শামসুজ্জামান, মিজু আহমেদ, আহমেদ শরীফ, মনোয়ার হোসেন ডিপজল, ডন- এরা সবাই হারিয়ে যাওয়া খলতারকা। এদের পরে নতুন করে ঢাকাই চলচ্চিত্রে দক্ষ খল-অভিনেতার সৃষ্টি হয়নি। এখন যেসব নতুন খলনায়ক অভিনয় করছেন, তাদের অধিকাংশই দর্শকদের মনে স্থান করে নিতে পারছেন না। বর্তমানে ডিজে সোহেল, শিমুল খান, জিয়া ভিমরুল, জুয়েলসহ কয়েকজন তরুণ অভিনেতা খলচরিত্রে অভিনয় করছেন বটে। কিন্তু কেউই কাঙ্ক্ষিত অভিনয় দর্শকদের উপহার দিতে পারছেন না।


এ বিষয়ে গুণী নির্মাতারা বলছেন, 'সবাই চলচ্চিত্রে এসে নায়ক-নায়িকা হতে চাচ্ছেন। কেউ খলনায়ক বা খলনায়িকা হতে চান না। কিন্তু তারা যদি এ চরিত্রে এসে ভালো অভিনয় করে, তাহলে দর্শক তাদেরও চিনবে। তাদের নামের ওপর ভিত্তি করে দর্শকরা হলে গিয়ে ছবি দেখবে। নতুন যারা আসবে, তারা তো একদিনে এসে এ জায়গা দখল করতে পারবে না। সময় নিয়ে তাদের কাজ করতে হবে। তাহলেই কেবল তারা নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।'


বর্তমানে চলচ্চিত্র নির্মাতারা একমাত্র খলনায়ক মিশা সওদাগরের ওপর নির্ভর করে আছেন। একমাত্র তিনিই দাপটের সঙ্গে চলচ্চিত্রে অভিনয় করে যাচ্ছেন। তিনি ১৯৮৬ সালে এফডিসির নতুন মুখের সন্ধানে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন। ১৯৯০ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ছটকু আহমেদের 'চেতনা' শীর্ষক চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে প্রথমে অভিনয় করেন। ১৯৯৫ সালে 'আশা আমার ভালোবাসা' ছবিতে খলনায়ক হিসেবে অভিনয় করে আলোচনায় আসেন। সেই সঙ্গে সাফল্যের সহিত এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজারের মতো ছবিতে খলনায়ক হিসেবে অভিনয় করেছেন।


চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে খল-অভিনেতার যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা দূর করতে তরুণ প্রজন্মকেই এগিয়ে আসতে হবে। তাদের নায়ক হওয়ার চিন্তা-ভাবনা দূর করে, খল-অভিনেতা হওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। তাদের বুঝতে হবে, একটি চলচ্চিত্রে খল-অভিনেতার গুরুত্ব সব থেকে বেশি। কারণ, তাদের ছাড়া চলচ্চিত্র প্রাণ পায় না। তাই খলনায়ক হওয়ার জন্য আগ্রহসহকারে তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে।