সীমান্তের এপার-ওপার যেন আর্জেন্তিনা-ব্রাজিল

By: 2018-06-21 19:00:40 আন্তর্জাতিক

আবহাওয়া বিভাগের বড়কর্তা জানেন কী হতে চলেছে৷ এর জন্য হাওয়া মোরগের ঘূর্ণি লক্ষ্য রাখতে হবে না৷ দেখতেও হবে না উপগ্রহ চিত্র৷ মারাত্মক ঝড়ের মুখে পড়তে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ৷ সীমান্তের এপার-ওপার তাতে তছনছ হয়ে যাবে৷ ফুটবল ঝড়ে বঙ্গোপসাগরের উপকূল বাসিন্দা লক্ষ লক্ষ বাঙালি আক্রান্ত হবেন৷ এদিকে আকাশের মুখভার৷ আষাঢ়ের প্রথম বারিধারায় পুষ্ট হচ্ছে বাংলা৷

বারিধারা ঢাকার অন্যতম অভিজাত এলাকা৷ আবার বৈশাখী হল কলকাতার অন্যতম আবাসন৷ দুই বাংলার রাজধানী শহরের অলি-গলি সর্বত্রই বিশ্বকাপের উত্তাপ৷ বৃহস্পতিবার ফের লড়াইয়ের ময়দানে আর্জেন্তিনা৷ আর শুক্রবার নামছে ব্রাজিল৷ সপ্তাহের মাঝামাঝি বাঙালির বৈঠকখানা থেকে আড্ডা সরগরম মেসি-নেইমারের ফুটবলীয় কারিকুরির গবেষণায়৷ বিশ্বকাপের আসরে টিকে থাকতে হলে দুই তারকার দলকেই জয়ী হতে হবে৷ সেই অর্থে মরণ-বাঁচন লড়াই৷ চারিদিকে কী হয় কী হয় রব৷


রুশ বিশ্বকাপ যেন অঘটনের খনি৷ ছোট দলের চমকের খতিয়ান লেখার খাতা৷ শুরু থেকেই বাঘেদের ছন্দপতন৷ গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির পরাজয়, আর্জেন্তিনা-ব্রাজিলের ড্র, মেসির পেনাল্টি মিস ও নেইমারের গোল না-পাওয়ায় এমনিতেই ফুটবল বোদ্ধা বাঙালির হৃদকম্প শুরু হয়ে গিয়েছে৷ সম্ভবত জিভের তলায় সরবিট্রেট নিয়েই দুটো দিন কাটাতে হবে৷ তারপর হয় ইসপার নয় উসপার৷

পূবের বাংলা অর্থাৎ পদ্মা-মেঘনার বাংলাদেশে ফুটবলের জ্বর এতটাই যে ব্রাজিল বনাম আর্জেন্তিনায় বিভক্ত বাংলাদেশিরা ঠিক কী করবেন ভেবে উঠতে পারছেন না৷ আবেগে চলছে বাড়ি রাঙানোর পালা৷ কোনও বাড়ি হলুদ-সবুজ তো কোনও বাড়ি নীল-সাদা৷ পাড়ায় পাড়ায় দু’পক্ষের মুখোমুখি বিভেদ স্পষ্ট৷ সীমান্ত পার করে যশোর হয়ে মাগুরা পেরিয়ে মানিকগঞ্জ হয়ে ঢাকা বা রংপুর থেকে রাজশাহী আবার দূরের চট্টগ্রাম-কুমিল্লা থেকে বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেঁসে বরিশাল ছাড়িয়ে ওই বাংলার ফুটবল ছবিতে চমক লেগেছে দুনিয়ার৷ ফুটবল ছিল একসময় উন্মাদনা৷ কিন্তু তাতে থাবা মেরেছে উজ্জ্বল ক্রিকেট পরিসংখ্যান৷ ফিফা ক্রম তালিকায় বাংলাদেশ ১৯০ এর আশেপাশে ঘুরছে৷ কিন্তু বিশ্বকাপের আবেগ ? সেটা যেন দুনিয়ার সর্বসেরা৷ পরিস্থিতিটা এমন যে খোদ ব্রাজিলের সংবাদ মাধ্যম চলে এসেছে বাংলাদেশে৷ শুরু হচ্ছে ব্রাজিলীয় প্রশিক্ষণে ফুটবল শিবিরও৷

আর আর্জেন্তিনা ? তার ঝলকও কিছু কম নয়৷ চরম আবেগতাড়িত দিয়েগো মারাদোনার দেশকে বাংলাদেশিরা নিজের ঘরের ছেলের মতো ভালোবাসা দিয়েছেন। এখনও তাতে ভাটা পড়েনি৷ মারাদোনার আত্মজীবনীর ‘এল ডিয়েগো’র শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ আছে বাংলাদেশের নাম। মূল স্প্যানিশ থেকে বইটি ইংরেজিতে অনুদিত বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন সাংবাদিক মার্সেলা মোরা আরাউজো। তাঁর লেখায়- বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের হয়ে কাজ করার সময় একটা খবর নিয়ে কিছু তথ্য সংগ্রহ করছিলাম৷ সে সময় খুঁজে পেয়েছি, ১৯৯৪ বিশ্বকাপে মারাদোনাকে বহিষ্কার করা হয় তখন বাংলাদেশে এত মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল, সেটা গণ আত্মহত্যা চেষ্টার রূপ নেয়। এই তো আর্জেন্তিনার আবেগ৷ সেই আবেগে রঙ ধরিয়েছেন মেসি৷ তিনিই ঈশ্বর তিনিই সব৷ এটা মনে রেখেই টিভির দিকে দুরুদুরু বুকে তাকিয়ে থাকবেন লাখো জনতা৷

পূবের পদ্মা তীরে যদি এই অবস্থা তাহলে পশ্চিমের গঙ্গা পারেও উন্মাদনার গতি প্রবল৷ কলকাতা ছাড়িয়ে চন্দননগর, বর্ধমান, বাঁকুড়া হয়ে ঝাড়খণ্ডের প্রান্ত সীমায় যেখানে জঙ্গল আর পাথুরি মাটিতে কয়লা খনির মানুষদের মনেও লেগেছে আর্জেন্তিনা-ব্রাজিলের রঙ৷ আবার উত্তরে কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে শিলিগুড়ি দার্জিলিং- কালিম্পং, জলপাইগুড়ি থেকে উদ্দাম তিস্তা-রঙ্গিত ছুঁয়ে চা বাগানে মিশেছে একই আবির৷ পশ্চিমবাংলা বিভক্ত দুই শিবিরে৷ পছন্দের দলের জার্সির রঙে এখানেও বাড়ি রঙিন৷

এই আবেগের রঙে মাঝে মধ্যেই কোথাও উঁকি দেয় ফ্রান্স কোথাও জার্মানি৷ বাংলাদেশি কৃষক চাষের জমি বিক্রি করে গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের পতাকা বানান৷ কলকাতার দুই বন্ধু রাতভর মহানগরের রাস্তায় প্রিয় দলের হয়ে ফটোশ্যুট করেন৷

যাই হোক আদতে ফুটবল মোহের স্বপ্নজালে সোনার কাঠি-রুপোর কাঠির গল্প বুনছেন বাঙালিরা৷