সিনেমা বাঁচাতে হল বাঁচাতে হবে: অমিত হাসান

রুহুল আমিন ভূঁইয়া

১৯৮৬ সালে ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সম্পৃক্ত হন। ১৯৯০ সালে মুক্তি পায় তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘চেতনা’। ছবিটি পরিচালনা করেন ছটকু আহমেদ। একক নায়ক হিসেবে তিনি প্রথম অভিনয় করেন মনোয়ার খোকনের ‘জ্যোতি’ চলচ্চিত্রে। এরপর তিনি উপহার দিয়েছেন ‘প্রেমের সমাধি’, ‘শেষ ঠিকানা’, ‘জিদ্দী’, ‘বিদ্রোহী প্রেমিক’, ‘তুমি শুধু তুমি’, ‘বাবা কেন চাকর’, ‘রঙিন উজান ভাটি’, ‘ভালবাসার ঘর’র মতো জনপ্রিয় সব চলচ্চিত্র। একটা সময়ে এসে তিনি খল অভিনেতা হিসেবে অভিনয় শুরু করেন। প্রযোজক হিসেবেও সফল। অভিনয় করেছেন ৬শর মত চলচ্চিত্রে। তিনি আর কেউ নয় পাঠক বলছি নায়ক থেকে খলনায়ক তকমা পাওয়া অমিত হাসানের কথা। ব্যস্ত আছেন ‘ইয়েস ম্যাডাম’সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্র নিয়ে।

সম্প্রতি চলচ্চিত্র শিল্প সংশ্লিষ্টদের সংগঠন বাংলাদেশ ফিল্ম ক্লাব লিমিটেডের নতুন সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন অমিত হাসান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আতিকুর রহমান লিটনকে হারিয়ে সংগঠনটির এক বছরের জন্য দায়িত্ব পেলেন তিনি। নির্বাচনে অমিত হাসানের পূর্ণ প্যানেল নির্বাচিত হয়েছে।

ফলাফলে উচ্ছ্বসিত হয়ে অমিত বলেন, ফিল্ম ক্লাবের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ভাল লাগছে। বিজয়ীরা মিলে ফিল্ম ক্লাবকে আরও সুন্দর পরিবেশ দেয়ার চেষ্টা করবো। শুরুতেই নতুন বছরের কর্ম-পরিকল্পনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এ অভিনেতা বলেন, নতুন বছরটি নতুন প্রত্যয়ে শুরু করতে চাই। বেশ কয়েকটি সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত আছি। এ বছরও দর্শকদের মাঝে ভিন্ন লুকে হাজির হবো। এছাড়াও নতুন ছবি নিয়ে কথা চলছে। আশা করি এ বছর হবে চলচ্চিত্রর বছর।

১৯৯০ থেকে ২০২০ প্রায় তিশ বছর চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে আছেন, অমিত হাসানের এই দীর্ঘ জার্নির অভিজ্ঞগতা সর্ম্পকে জানতে চাই? অভিজ্ঞগতা এক কথায় দারুণ। কিভাবে যে এত তারাতরি সময় চলে গেল বুঝতেই পারলাম না। মনে হচ্ছে এইতো সে দিন শুরু করলাম। তিশ বছর অনেক অভিজ্ঞগতা হয়েছে। তবে আক্ষেপ হয় চলচ্চিত্রর রমরমা সেই সোনালী দিন আর নেই। খুব আফসোস হয় আবার যদি ফিরে পেতাম সেই সোনালী দিন।

নায়ক হিসেবে অমিত হাসান কেন প্রথম সারির হতে পারল না? একটানা অসংখ্যা সুপারহিট ছবি উপহার দিয়েছি। সেগুলো কি প্রথমসারির সিনেমা ছিল না? সময়ের পরিক্রমায় সব কিছুরই পরিবর্তন হয়। একটানা নায়ক হিসেবে অনেক ছবিতে অভিনয় করেছি। সব গুলো ছবি ছিল সুপারহিট। নতুনদেরও সুযোগ দিতে হবে। একটা জায়গা দখল করে থাকলে তো হবে না। তাই অন্যদের সুযোগ দিলাম। সবাই চেষ্টা করে নায়ক হবার, আপনি কেন নায়ক থেকে খলনায়ক হলেন? একটানা নায়ক চরিত্রে অভিনয় করার পর মনে হয়েছে নতুনদের সুযোগ দেওয়া দরকার তাই খল-নায়ক চরিত্রে অভিনয় করা। আমিত হাসান কাকে বেশি এনজয় করে নায়ক নাকি খল-নায়ক? ভাগ করতে চাই না। দুটির মজা দুই রকম। তবে দুইটিই এনজয় করি।

অমিত হাসান ২০০৮ সালে প্রযোজকের খাতায় নাম লেখান এবং টেলিভিউ নামে একটি প্রযোজনা সংস্থা চালু করেন। এই সংস্থা থেকে প্রযোজিত প্রথম চলচ্চিত্র কে আপন কে পর। সর্বশেষ শাহীন-সুমন পরিচালিত চলচ্চিত্রটি ২০১১ সালে মুক্তি পায়। তারপর আর প্রযোজনায় দেখা যায়নি। কিন্তু কেন? এখন চলচ্চিত্রর অবস্থা খুবই ভয়াবহ। এ সময়ে এসে মূলধান উঠানো কষ্ঠকার। যার কারনে বিরতি নেওয়া। সামনে ইচ্ছে আছে ফের প্রযোজনা করার। যতটুকু জানি আপনি নাটকেও অভিনয় করেছেন। নাটকে নিয়মিত হবেন? ভালো গল্প পেয়েছিলাম বলে নাটকে দেখা গেছে। ভালো গল্প পেলে এখনও কাজ করার ইচ্ছে আছে। নাটকে কাজ করতে আপওি নেই।

অর্ধশত কবিতা আর বেশ কয়েকটি গল্পও লিখেছেন। সামনে বইমেলায় বই বের করার পরিকল্পনা আছে? প্রতি বছর বইমেলা আসলে ইচ্ছে করে বই বের করতে কিন্তু ব্যস্ততার কারনে করা হয় না। প্রতি বছরই মেলা চলে গেলে সিদান্ত নেই আগামী বছর বই বের করব। কিন্তু আর হয়ে উঠে না। এ বছরই প্রস্তুতি নেব। ২০২১ সালে বইমেলায় বই বের করবোই। দেশীয় চলচ্চিত্রের অবস্থা সন্তোষজনক নয়- এই বাক্যটি গত এক দশক ধরেই ইন্ডাস্ট্রিতে শোনা যায়। প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা দিন দিন কমছে। এক সময়ের হাজারোর্ধ সিনেমা হলের জায়গায় বর্তমানে অবশিষ্ট রয়েছে কেবল হাতে গোনা কয়েকটি হল। দিন দিন এই সংখ্যাটাও হ্রাস পাচ্ছে। দেশি চলচ্চিত্রের দৈন্য। হতাশা এখানেই ঝাপটা মেরে ক্ষান্ত নয়। এসব হল বছরজুড়ে সচল রাখার মতো নতুন ছবির আকাল। জবরদস্ত লগ্নি নেই, এক নামে ঘাই মারার মতো পরিচালক নেই, আর নায়ক-নায়িকার আক্রা তো আছেই।

সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, সিনেমা নির্মাণ কমে আসছে, এই বিষয়গুলো কতোটা ভাবায় একজন অভিনয় শিল্পী হিসেবে? অনেক ভাবায়। প্রতি বছরই চলচ্চিত্রর সংখ্যা কমে যাচ্ছে, হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চলচ্চিত্রর রমরমা অবস্থা বিলপ্ত প্রায়! সিনেমার সুদিন ফেরাতে সরকারের সহযোগীতা দরকার। সরকারি উদ্যোগে আধুনিক সিনেমা হল তৈরি করতে হবে। এবং সবাইকে সিনেমার সুদিন ফেরাতে কাজ করতে হবে।

সবার মুখে একটাই কথা, ফিল্মপাড়ায় সংকট। উওরণের কোনো আইডিয়া আছে? নতুন নতুন প্রযোজক আনতে হবে। ভালো গল্পকার ও নতুন অভিনয় শিল্পী তৈরি করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি ভাবে যেটা দরকার সেটি হচ্ছে সরকারি উদ্যোগে সিনেমা হল তৈরি করতে হবে। সিনেমা বাঁচাতে হলে আগে হল বাঁচাতে হবে। ভালো ছবি চালাতে দরকার ভালো মেশিন, সাউন্ড সিস্টেম। হলের পরিবেশ ফেরাতে দরকার এয়ারকন্ডিশন, বসার ভালো আসন। সিনেমা বাঁচাতে প্রচুর সিনেমা হল দরকার। মাল্টিপ্লেক্স দরকার। আমাদের দাবি, সরকারি খরচে মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণ ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় সেসব পরিচালনা করা হোক। ৬৪ জেলায় অাধুনিক সিনেমা হল নির্মাণ করতে হবে। বিলুপ্ত সিনেমা হল এবং চলচ্চিত্রের সোনালি দিন ফেরাতে যুগোপযোগী চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে।

অনেকেই বলছেন সিনেমায় মৌলিক গল্পের অভাব রয়েছে। এ নিয়ে আপনার মন্তব্য কি? অবশ্যই অভাব রয়েছে। ভালো গল্পকার নেই যার কারনে ভালো সিনেমাও নেই। সদ্য সমাপ্ত বছর আমার অভিনীত মাত্র একটি ছবি ব্যবসা সফল হয়েছে। এক দুইটি ছবি দিয়ে চলচ্চিত্র শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। চলচ্চিত্র বাঁচাতে গল্পকার তৈরি করতে হবে।

সিনেমার সংখ্যা বাঁড়াতে হবে। বছর বছর সিনেমা মুক্তির সংখ্যা কমছে, একজন অভিজ্ঞ চলচ্চিত্র শিল্পী হিসেবে বিষয়টি অমিত হাসানকে অনেক ভাবায়। তিনি মনে করেন এক দুইটি সিনেমা দিয়ে কখনোই এই শিল্পটি বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। অমিত হাসান বলেন, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন ব্যবস্থা একটা খারাপ সময় পার করছে। দু-একটা ছবি মাঝে-মধ্যে সিনেমা হলের দৃশ্যপট বদলে দেয়। ভালো ব্যবসাও করে। শুধুমাত্র দু-একটা ছবির ওপর একটা শিল্প তো দাঁড়াতো পারে না। আমাদের হল নেই, ছবি নেই, ছবিতে গল্প নেই, বাজেট নেই। দেশের হাজারো সিনেমা হল এখন শপিং সেন্টারে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। মুমূর্ষু চলচ্চিত্রশিল্পকে বাঁচাতে সরকারের নজরদারি বাড়ুক। সরকার নিজেই বিনিয়োগ করুক সিনেমায়। নিজে আয় করুক, চলচ্চিত্রকর্মী ও শিল্পীদের বাঁচিয়ে রাখুক। মনোযোগ না দিলে শিল্প যেমন সৃষ্টি করা যায় না, তেমনি যথাযথ প্রণোদনা ও দেখভাল না করলে সিনেমার মতো বড় শিল্পমাধ্যম বাঁচানো যাবে না।