শুভ জন্মদিন এটিএম শামসুজ্জামান

(অরণ্য শোয়েব)-বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নাটকের প্রবাদপুরুষ তিনি। নেতিবাচক চরিত্রের জন্য হুমায়ুন ফরিদীর পাশপাশি আর যে একটা নাম বারবার উচ্চারিত হয় সেটা হল এটিএম শামসুজ্জামানের।

একাধারে তার অনেকগুলো পরিচয়। তিনি অভিনেতা, পরিচালক, কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপকার ও গল্পকার। জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, প্রশংসিতও হয়েছেন। শিল্প ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখার জন্য দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক পেয়েছেন ২০১৭ সালে। শুধু তাই নয়, পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি।

১৯৪১ সালের আজকের দিনে জন্মেছিলেন নোয়াখালীর নানাবাড়িতে। তার বাবা নূরুজ্জামান ছিলেন নামকরা উকিল, জড়িত ছিলেন রাজনীতিতেও। মা নুরুন্নেসা বেগম। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে শামসুজ্জামান ছিলেন সবার বড়। ছাত্রজীবনে পড়াশোনা করেছেন ঢাকার পগোজ স্কুল, কলেজিয়েট স্কুল, রাজশাহীর লোকনাথ হাই স্কুলে।

১৯৬১ সালে উদয়ন চৌধুরীর ‘বিষকন্যা’ সিনেমায সহকারী পরিচালক ছিলেন। সেটাই চলচ্চিত্রাঙ্গণে তার সূচনা। অভিনেতা হিসেবে তার আগমণ হয় ১৯৬৫ সালে। ১৯৭৬ সালে আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ সিনেমায় প্রথমবারের মত খল নায়কের ভূমিকায় আবির্ভাব ঘটে তার। বেশ আলোচিত হন। ১৯৮৭ সারে মুক্তি পাওয়া কাজী হায়াতের ‘দায়ী কে’ প্রধান চরিত্রে ছিলেন তিনি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়ে যান তার সুবাদে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

অশিক্ষিত, গোলাপী এখন ট্রেনে, পদ্মা মেঘনা যমুনা, স্বপ্নের নায়ক – সিনেমাগুলো যেমন তাকে খলনায়ক হিসেবে খ্যাতি এনে দেয় তেমনি কৌতুক অভিনেতা হিসেবে এটিএম জলছবি, যাদুর বাঁশি, রামের সুমতি, ম্যাডাম ফুলি, চুড়িওয়ালা, মন বসে না পড়ার টেবিলে – ইত্যাদি চলচ্চিত্রে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

২০০৫ সালে ‘মোল্লা বাড়ি বউ’ সিনেমাটি তাঁর আলোচিত কাজগুলোর একটি। সেবার এই চরিত্রটির জন্য সবাইকে পেছনে ফেলে জিতেছিলেন মেরিল-প্রথম আলোর দেওয়া সেরা অভিনেতার পুরস্কার। ২০০৯ সালে এককভাবে পরিচালনা করেছিলেন রিয়াজ-শাবনূর অভিনীত ‘এবাদত’ সিনেমাটি। ২০১৫ সালে তিনি পান একুশে পদক।

দেশীয় চলচ্চিত্রে আশির দশকের বিখ্যাত পত্রিকা ‘চিত্রালী’-তে অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান, কে নিয়ে একটা লেখায় বলা হয়েছিল-‘এটিএম ছাড়া ছবি জমে না।’ কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। তিনি এমন এক ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ভাল-মন্দ, কৌতুক – যেকোনো চরিত্রে স্বাচ্ছন্দে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। নিঁখুত অভিনয় দক্ষতা তাকে ঢাকাই ফিল্ম ইন্ড্রাস্টিতে দিয়েছিল আলাদা মর্যাদা।

তবে, এই সবই এখন অতীত। এখন আর সিনেমায় দেখা যায় না এই কিংবদন্তিকে। এফডিসি যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছেন কেন? সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই ব্যাখ্যাই দিলেন, ‘সেখানে গিয়ে কি করব? আমার তো কাজ নেই। আমার তো দরকার নেই সেখানে। যেটুকু অভিনয় করি টেলিভিশনের জন্য করা হয়। একটা কথা তোমরা ভালো করেই জানো আমার টাকা পয়সার ক্ষুধা আর নেই। তারপরও আমি অভিনয় করি করতে চাই। এর কী কারণ হতে পারে? এর একটাই কারণ, এটা যদি ছেড়ে দেই আমি মরে যাব। বাঁচার জন্য নাটকে অভিনয় করি। কিন্তু সিনেমা তো আমাদের পাশ করে রাখল। হয়তো মরে গেলে সম্মাননা দিবে। যে মানুষটা এই বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি শুরু থেকে কাজ করছে জীবিত অবস্থায় তাঁর কাজ নেই। এর চেয়ে আর বড় কষ্ট কী থাকতে পারে!’

এমন একজন গুণী শিল্পীকে তার যথার্থ সম্মান দিতে পারছে না ঢাকাই চলচ্চিত্র ইন্ড্রাস্ট্রি। ঢাকাই সিনেমার সুমতি ফিরুক – এটিএম শামসুজ্জামানের মত শিল্পীরা সম্মান ফিরে পান, সেই প্রত্যাশা রইলো। আগের মত সম্মান না পেলেও আগের মত জনপ্রিয়তা যে আছে সেটা বোঝা যায়, বারবার বাতাসে ভেসে আসা তাঁর মৃত্যুর গুজবে।

আর প্রতিবারই তিনি এসে বলেন, ‘আমি বেঁচে আছি।’ এটিএম শামসুজ্জামানের মত মানুষরা বেঁচে থাকুক অনন্তকাল