আমি আর নেই মা…|| সাবেরা ফারুকী

মা মাগো!আমি মরার আগেই মরেছি, করার আগেই হেরেছি
গড়ার আগেই অংকুরে হয়েছি বিনষ্ট।

কেন কাঁদছ? কিসের এত্ত কষ্ট?

না মা, আমি স্বার্থপরের মত চলে যাইনি,আমাকে বাধ্য করেছিল মানুষরুপী কালোশিক্ষা আর ক্ষমতার লোভ!

একটু শোন,আমার কিন্তু খুব খুব খুবই কষ্ট হচ্ছিল। আমি নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না, এলোপাথাড়ি স্ট্যাম্পের ঢালি আর অকথ্য গালি উহ্!সে আমি ছাড়া কেউ বুঝবেনা।আমি নিস্তেজ হয়ে কাতরাই আর ওরা বলে দেখ ঢং করছে,আরও মার, ওকে আরও ২ ঘন্টা পেটানো যাবে।মা ওরা কি জানেনা -“মৃত্যু নিয়ে কি ঢং করা যায়?” এ কষ্ট কি করে বোঝাই।
সাগর সম পানি পিপাসা।ওরা পানি দেয়না,মেরে মেরে আরও ঘাম ঝরায় ।আমি অচেতন হয়ে প্রস্রাব করে ফেলি,আমি ঘেমে ভিজে একাকার।বমি হয় কয়েকবার।সে কি যন্ত্রণা!

মা যে মাথায় চুলে তুমি হাত বুলিয়ে দিতে, বাবা আমার রেজাল্ট নিয়ে এসেই মাথায় আদর করে বলত ফার্স্ট হয়েছিস বাবা।অনেক বড় হ।না বাবা,আমাকে তোমার প্রত্যাশার মত বড় হতে দেয়নি ওরা।আমার সে মাথায় চুলে জোরে জোরে টেনে ফ্লোরে ফেলে মেরেছে।যে হাত ধরে স্কুলে আর মেলায় নিয়ে যেতে যেন ঠিকঠাক রাস্তা পার হই,যেন হারিয়ে না যাই সে হাতটা। হুম সে হাতটায় এত পিটিয়েছে যে অবশ হয়ে গেছিল।টের পাচ্ছি শুধু ব্যথা আর ব্যথা।মা জ্বর আসলে আমার হাত পা মুছিয়ে দিতে আর পা মোছার সময় আমি বলতাম থাক মা লাগবেনা, আমি ভাল আছি দেখো জ্বর চলে গেছে।আমার শুধু মনে হত মা পায়ে হাত দিলে যদি মাকে অসম্মান করা হয়। তুমি তবুও পা মুছে দিতে। সেই পায়ে ওরা এত বেশি আঘাত করেছে তখনও মনে হয়েছিল ওরা তো বড়ভাই। কেন আমার পা ছোঁয়, ওদের অস্মান হল বুঝি।তখন পিঠ বিছিয়ে দেই।আর ওরা পিঠটাকে ব্যথার মাঠ বানায়।মনে হচ্ছিল সাপের ছোবল। আমি কি করব বলো!মনে হল মরে যাচ্ছি।আর তখন কে যেন কি খাওয়ালো,একটা ঔষধও দিল।তখন কেন জানি মনে হল বেঁচে যাবো।আমি আবার মায়ের কাছে ফিরে যাবো।বাবাকে জড়িয়ে নিব।ছোটনকে নিয়ে সাইকেল আর সাঁতার শেখাবো,অংক করাবো।
মা সামনে শীত তুমি বলেছিলে পিঠা বানাবে, কত আশা ভর করছিল মুহূর্তে। এশার আযান শুনেছি, নামাযের সময় বুঝি শেষ হয়ে যাচ্ছে।ভাবি,আমি জামাত না পেলে নাহয় রুমেই আদায় করব নামায।কলিজা ধরফর করছিল,গা গুলিয়ে যাচ্ছিল।অমনি ভেতর থেকে বমি আর ফেনা বের হল।আমি আরও নিস্তেজ হলাম।তখনও অনিক ভাই এসে পিঠে লাথি আর লাথি।আরও যাদের নাম শুনছ তোমরা আমি তখনও কারো মুখে তাকানোর শক্তি পাইনি।বাকীরাও লাথি থাপ্পর দিচ্ছিল।মৃত্যুদুত হাজির।আমি নিরুপায়।ওরা মনে হয় বুঝতে পারল আমি শেষ হচ্ছি। তখন সবাই মিলে টেনেহিচড়ে সিঁড়ির দিকে নেয়।মা তখন মনে হয়েছিল মৃত্যুযন্ত্রনা আমার, তোমরা একটু শান্তিতে কালিমা পরে বিদায় দিতে দাও মিনতি করছি।কিন্তু না!ওরা দ্রুত নামায়। দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নামতেই আমি শেষ নিশ্বাসটা হারাই।আমি মৃত্যু। কিছু করার নেই।মাকে ছোঁয়ার শক্তি নেই।বুকটা খালি লাগছে আর মনে হচ্ছে আমার মৃত্যুর খবরটা পেলে মা, বাবা,ছোটন কেমনে সইবে,কেমনে মেনে নিবে?????

কি দোষ আমার? নিজেও ঠিক বুঝিনি।আমার মৃত্যুর পর যখন নিউজে দেখলাম আমার স্টাটাস আর শিবির সন্দেহে আমাকে মেরেছে।তখন অজস্র কষ্টেও ধিক্কারে একটা অট্টহাসি চলে এসেছে।
হায়রে!
স্বাধীন দেশে পরাধীন জাতি।হায়রে! অবুঝ জাতি।
(বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ স্মরণে)

বিঃদ্রঃলেখাটা লেখার সময় কাব্যিক ভাষায় শব্দচয়ন কিংবা ভাষার মেলবন্ধনের চেষ্টা করিনি,করতে পারিনি।কারন ছন্দ,মাত্রা ঠিক রাখতে গেলে অনেক কথা ছুটে যাবে হয়ত।তাই কবিতা গল্প ভেবে না, মনের অভিব্যক্তি আর কষ্টের উপলব্ধি শেয়ার করেছি মাত্র।আমিও একজন মা,আমি কাঁদি।বারবার কাঁদি আবরারের মায়ের কথা ভেবে।কেমনে সইবে ঐ মা।আমার সন্তান যখন ঘুম থেকে জাগে একটু কুন করে শব্দ করে রান্নাঘর থেকে দৌড়ে ছুটে আসি।কোলে তুলে নেই,সামাল দেই,চুমো খাই,খাবার যোগান দেই।যেন একটুও কষ্ট না পায়।ওকে কেউ আদর করলে সে মানুষটাকে আপন মনে হয়।কেউ একটু তুই করে বললে মনে হয় আমার বাচ্চাকে বুঝি ভালবাসেনা।হাতটা জোরে ধরলে বারবার তাকাই ও ব্যথা পায় কিনা?আবরারের মা নিশ্চয়ই এমনি ভেবেছে। সে সন্তানের হাতে এত জখম কেমনে সইবে মা?ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে খেলনা গাড়ি আর নতুন বই দিয়ে যে সন্তানকে বাবা খুশি করত,সে বাবা কি করে নিস্তেজ মুখখানা দেখবে?পিঠে হাত বুলাত।সে পিঠে এত এত কালো ছোপ!
আমি ভাষা হারাই,শব্দ না এসে শুধুই হাহাকার!আর লজ্জা,ঘৃনা কিংবা ব্যর্থতায় ডুবে মরি।কান্না চলে আসে।আফসোস!

 

ফেসবুক থেকে নেয়া…