আনোয়ারা: বাংলা ছবির অবিস্মরণীয় এক ব্র্যান্ড

আনোয়ারার জন্ম ১৯৪৮ সালের পহেলা জুন। পুরো নাম আনোয়ারা জামাল। অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্যে পারদর্শী ছিলেন। নৃত্যশিল্পী হিসেবেই চলচ্চিত্রে পা রাখেন। সেইখান থেকেই জহির রায়হানের ‘সঙ্গম’ সিনেমা দিয়ে প্রথম পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেন। পরবর্তীতে তিনি হয়ে উঠেন আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির ‘পার্শ্বচরিত্রের সম্রাজ্ঞী’।

এই কিংবদন্তী অভিনেত্রীর গতকাল ছিল জন্মদিন | তার জীবনে জানা অজানা নিয়ে লিখেছেন অরণ্য শোয়েব ….

নবাব সিরাজউদ্দৌলায় আলেয়ার চরিত্রে অভিনয় করে আনোয়ারা এখনও অনেকের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করেন। আলেয়ার চরিত্র তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১৯৬৭ সালে রিলিজ হওয়ার পরে কোথাও মঞ্চ নাটক কিংবা যাত্রা অনুষ্ঠিত হলে আলেয়ার চরিত্রটি আনোয়ারার জন্য নির্ধারিত ছিল। তখন তার নাম ছিল আনোয়ারা জামাল।

আর নবাব সিরাজউদ্দৌলা সাজতেন আনোয়ার হোসেন। আনোয়ারা জামাল হাতে গোনা কয়েকটি ছবিতে নায়িকা ও সহনায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মা ও খালার চরিত্রে অবতীর্ণ হয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলেন। নৃত্যশিল্পী হিসেবেই তার সর্বপ্রথম চলচ্চিত্রে আগমন। ‘নাচঘর’ আর ‘প্রীতি না জানে রীত’ ছবি দুটিতে তিনি ছিলেন নাচনেওয়ালী। নেচে নেচে পুরুষদের মন জয় করেছিলেন। ১৯৬৩ সালে ছবি ২টি মুক্তি পায়।

১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সংগম (উর্দু ছবি) ছবিতে সহনায়িকা হিসেবে তার প্রথম অভিনয় শুরু। তার নায়ক ছিলেন সোহেল। ১৯৬৬ সালে ‘বালা’ ছবিতে একক নায়িকা হওয়ার সুযোগ আসে তার জীবনে। ‘বালা’ ছিল উর্দু ছবি। ছবিটি রিলিজ হয় ১৯৬৭ সালে। তার নায়ক ছিলেন হায়দার শফী। সে বছরই (১৯৬৭) ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ রিলিজ হয়। এ ছবিটি অভাবনীয় ব্যবসা সফল হওয়াতে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ উর্দুতে চিত্রায়িত হলো। ওই ছবিতেও আনোয়ারাকে নর্তকী আলেয়া সাজতে হয়েছিল। ছবিটি লাহোর, করাচি, কোয়েটা, মুলতান, পেশোয়ারে রিলিজের পর তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানেও আনোয়ারার নামধাম ছড়িয়ে পড়ল।

আজকের দিনের সিনেমা দর্শকরা জানেন না আনোয়ারা জামাল যে এক সময় নৃত্যশিল্পী-নায়িকা ও সহনায়িকা ছিলেন। ১৯৬১ সালে তাকে ফিল্মে নিয়ে আসেন তার চাচা। ‘আজান’ ছবিতে প্রথম গ্রুপ ডান্সে অংশ নিয়েছিলেন এই আনোয়ারা। পরে এ ছবিটি মুক্তি পায়নি। ‘আজান’ ছবিতে কাজ করার সময় আনোয়ারা ঢাকার লালবাগের পলাশী গার্লস স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন।

‘সংগম’-এর পরে ‘কাজল’ এবং ‘একালের রূপকথা’ ছবি ২টিতে অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন। ১৯৬৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জানাজানি’ আনোয়ারার জীবনে এক উল্লেখযোগ্য ছবি। ওই ছবিতে তার নায়ক ছিলেন শওকত আকবর। ‘জানাজানি’তে গরিব ঘরের মেয়ের ভূমিকায় থেকে তিনি ফুটপাতে নাচতেন ও গাইতেন। তার লিপে ছিল— ‘এই দুনিয়ায় ফুটপাতে হায় জীবন কাটে হায় কেমন করে’ এই গানখানি। ১৯৬৪ থেকে ৬৬ সালের মধ্যে তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে কয়েকটি হলো—শাদী, বন্ধন, শীত, বিকেল, মিলন, সাত রং, ক্যায়সে কুহু, কার বউ, কাগজের নৌকা, ১৩নং ফেকু ওস্তাগার লেন, বেগানা, ভাওয়াল সন্ন্যাসী, ভাইয়া প্রভৃতি।

এসব ছবিতে তিনি ছিলেন সহশিল্পী। তবে একজন পরিপূর্ণ অভিনেত্রী হিসেবে আনোয়ারার প্রথম উপস্থিতি ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবিতে। এই ছবিতে তিনি ‘আলেয়া’ হয়ে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য নিজের প্রাণ বলি দিতে একটুও দ্বিধা করেননি। প্রাণপণ চেষ্টা করে আলেয়াকে সঠিক ও সফলভাবে রূপায়িত করেছিলেন। ছবিটি রিলিজের পর আনোয়ারার নামধাম ছড়িয়ে পড়ল দেশজুড়ে। যখন যেখানে গেছেন সেখানেই তাকে ঘিরে দর্শকের ভিড় জমে উঠত। সবাই তাকে বলত, এই যে ‘আলেয়া’ এসেছে। তার লিপে—‘পথ হারা পাখি কেঁদে মরে’, ‘কেন প্রেম যমুনা পাজি হল ধীর’ এবং ‘আমি আলোর শিখা’ গান তিনখানি অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়।

এক সময় আনোয়ারা খলনায়িকা অর্থাত্ ভ্যাম্প গার্ল চরিত্রেও অভিনয় করেন। ১৯৭২ সালের পর থেকে তিনি চাচী, মা ও শাশুড়ির চরিত্রেই বেশি উপস্থিত হয়েছেন। সেসব ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—মা, জননী, অগ্নিশিখা, গোলাপি এখন ট্রেনে, কার পাপে, ডুমুরের ফুল, লাল কাজল, নদের চাঁদ, নবাব, কসাই, ঈদ মোবারক, জারকা, দীন দুনিয়া, শুভদা, সখিনার যুদ্ধ প্রভৃতি।

১৯৮২ সালে ‘দেবদাস’ ছবিতে আনোয়ারা চন্দ্রমুখীর চরিত্রে অভিনয় করে জানিয়েছিলেন— বারবনিতারূপে তার যে তুলনা নেই। চন্দ্রমুখীর চরিত্রে তার অসাধারণ অভিনয় দর্শককে সেদিন মনোরঞ্জন দিয়েছিল। আজও সেদিনের দর্শকদের স্মৃতি চন্দ্রমুখীরূপী আনোয়ারা অমলিন হয়ে রইলেন।

অভিনেত্রী আনোয়ারাকে সবচেয়ে বেশি ভালো ব্যবহার করেছিলেন আমজাদ হোসেন। তাঁর নির্মিত নয়ন মনি, গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, জন্ম থেকে জ্বলছি, দুই পয়সার আলতা’য় অনবদ্য অভিনয় সেটাই প্রমাণ করে।

১৯৭৮ সালে আমজাদ হোসেনের বিখ্যাত সিনেমা ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’-তে ‘ময়না বু’ চরিত্রে অতুলনীয় অভিনয় করে নায়িকা ববিতার-ই সমান আলোচিত হয়েছেন। গোলাপীর পাশাপাশি ‘ময়না বু’ চরিত্রটি হয়ে উঠেছিল নারী সংগ্রামের প্রতীক। দর্শকদের কাছ থেকে বিপুল প্রশংসা পাওয়ার পর জুরি বোর্ডের রায়ে প্রথমবারের মত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন আনোয়ারা।

পরবর্তীতে সেই জাতীয় পুরস্কার নিজের হাতে তুলেছেন একবার হ্যাটট্টিক সহ মোট আটবার। তখনকার সব দাপুটে নায়িকাদের হারিয়ে ‘শুভদা’ সিনেমার জন্য সেরা অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পেয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন।

বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি মমতাময়ী মায়ের চরিত্রে প্রতিষ্ঠিত। সবচেয়ে জনপ্রিয় মা তিনি। বেশিরভাগ ছবিতেই তিনি স্বামীকে হারিয়ে সন্তানদের প্রতিষ্টিত করতেন। মায়ের চরিত্রে তিনি নিজেকে এতটাই জীবন্ত করে তুলতেন যেন তিনি সত্যিকারের মা। সন্তানের ভুলে রাগ করে যে চোখ বড় বড় করে তাকাতেন এটাতে অনেকেই ভয় পেয়ে যেতেন।

আমজাদ হোসেনের ‘নয়ন মণি’তে প্রথম চাচীর চরিত্রে অভিনয় করে মাতৃরুপে আলোচিত হন। মূলত আশি ও নব্বই দশকে মায়ের চরিত্রে অভিনয় করে তুমুল আলোচিত হন। বয়সে প্রায় সমসাময়িক হলেও ভাত দে, গরিবের বউ,অবুঝ সন্তান সহ অসংখ্য ছবিতে শাবানার মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সবচেয়ে বেশি।

চলচ্চিত্রে অভিনয় করে আনোয়ারা বহু পুরস্কার পেয়েছেন। প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৭৮ সালে ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ছাড়াও বিভিন্ন সমিতির পুরস্কার পেয়েছেন।

‘ও দাদী ও দাদী আমি তোমার দিওয়ানা’ – শিবলি সাদিকের ১৯৯৪ সালে নির্মিত ‘অন্তরে অন্তরে’ সিনেমায় মায়ের চরিত্র ছেড়ে প্রথম সালমান শাহর দাদীর চরিত্রে অভিনয় করেন। আর এই দাদীমা চরিত্রেও তিনি ছিলেন দারুণ সফল, এই সিনেমা দিয়েই তিনি সর্বশেষ জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন।

একই বছর ‘সুজন সখি’র রিমেকে দাদী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। দাম্ভিকতা পূর্ণ দাদীমা থেকে মায়াভরা দাদীমা চরিত্রে তিনি বৈচিত্র্যতা এনেছিলেন। এর অনেক বছর পর ডিপজল উনাকে দিয়েই ‘দাদীমা’ সিনেমাটি নির্মাণ করেন। সর্বশেষ ‘পোড়ামন ২’ তে দাদীমার চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

এছাড়া তখনকার অনেক ছবিতে নায়ক-নায়িকা যেই-ই থাকুক মায়ের চরিত্রে তিনি ছিলেন নিয়মিত তারকা। আলমগীর, জসিম, ইলিয়াস কাঞ্চন থেকে মান্না, রিয়াজ, শাকিব খানের পর্যন্ত মা হয়েছেন বিভিন্ন ছবিতে। কাজী হায়াতের ‘দাঙ্গা’ সিনেমা থেকে হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমায় মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

শুধু যে মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তা নয়, দেবদাসের বিখ্যাত চন্দ্রমুখী চরিত্রে যে অসাধারণ অভিনয় করেছেন তা প্রতিট দর্শকদের চোখেই চির অম্লান। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিষবৃক্ষ অবলম্বনে নির্মিত ‘বিরহ ব্যাথা’ সিনেমায় লোভী গৃহ পরিচারিকার চরিত্রে অভিনয় করে প্রধান দুই নায়িকাকেও যেন ছাপিয়ে গিয়েছিলেন।

আনোয়ারার বিয়ে হয় ১৯৭২ সালে মুহিতুল ইসলাম মুহিতের সঙ্গে। তাদের একমাত্র কন্যার নাম মুক্তি। তিনিও অভিনয়ের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। সেই আনোয়ারার হাতে এখন আর কোনো ছবি নেই। ছবির জগত্ থেকে তিনি আজ হারিয়ে যেতে বসেছেন।

নব্বইয়ের শেষ দিক হতেই তিনি ধীরে ধীরে ম্লান হতে থাকেন। যিনি এক সময় ছিলেন শোষিত নারী শ্রেণির প্রতীক। সেই আনোয়ারাকেই যেন আর ওসব চরিত্রে মানাচ্ছিল না। শেষের দিকে মান্নার মা হয়েছেন বেশি। তখনকার বাণিজ্যিক সিনেমার সাথে তাল মিলাতেই গিয়ে উচ্চকিত অভিনয় করতেন।

সম্প্রতি শুনলাম তিনি ‘আমার মা’ ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। অভিনেত্রী হিসেবে আনোয়ারা নিজেকে অনেক উচ্চ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাই অনুরোধ তিনি যেন সিনেমা নির্বাচনে সচেতন থাকেন।

তবে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবির আলেয়া আর ‘দেবদাস’-এর চন্দ্রমুখী চরিত্র দুটি তাকে স্মরণীয় করে রাখবে। আর এজন্য আনোয়ারাও হয়ে থাকবেন কিংবদন্তি।