আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে সাংবাদিক রোজের স্মৃতিচারণ

শোবিজ অঙ্গনের প্রিয়মুখ বিনোদন ২৪ .কমের এডিটর মইনুল হক রোজ।সাংবাদিক ক্যারিয়ারে প্রায় দুইযুগ পাড় করার পথে।এত বছর সাংবাদিক ক্যারিয়ারে অনেক অভিনেতা অভিনেত্রী গায়ক গায়িকার সঙ্গে হয়েছে বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসা।

তবে সব তারকাদের মধ্যে একজনের প্রেমে একটু বেশিই নিমজ্জিত ছিলেন এই তারকা সাংবাদিক।তিনি হচ্ছেন উপমহাদেশের সেরা গিটারিস্ট, রকস্টার এলআরবি’র জনক জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চু।

আইয়ুব বাচ্চু’র সঙ্গে সাংবাদিক রোজের সম্পর্কটা ‘আর্টিস্ট -জার্নালিস্ট ‘ ছিল না।বরং সম্পর্কটা ছিল পারিবারিক ‘বড় ভাই ও ছোট ভাই এর মতো’।সাংবাদিক রোজের আইয়ুব বাচ্চু সম্পর্কে কথা বললে হয়তো শেষ করা সম্ভব হবেনা।

আইয়ুব বাচ্চু আজ এই দিনে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।তার চলে যাওয়াটা এখনো মেনে নিতে পারছেন না এই দেশের সংগীতপ্রেমীরা এমনকি এই সাংবাদিকও।কোটি তারার মাঝে একটি তারা খসে পরলে মেনে নেয়া সম্ভব কিন্তু গোটা একটি চাদ হারিয়ে গেলে সেটি মানা কিংবা ভোলা যায় না।

আইয়ুব বাচ্চু চলে যাওয়ার আজ এক বছর আজ।দেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে তার গাওয়া গান এবং পূর্বের সাক্ষাৎকারগুলো প্রচারিত করা হবে।

আইয়ুব বাচ্চু কে নিয়ে ফেসবুকে আবেগঘন স্মৃতিচারণ সাংবাদিক মইনুল হক রোজের।তার ফেসবুকে আইয়ুব বাচ্চু কে নিয়ে কিছু কথা তিনি উল্লেখ করেছেন ‘বাংলা প্রতিদিন’ এর পাঠকদের জন্য তা হুবহু তুলে ধরা হলো

আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ প্রায়ই আমাকে বলতো,বলে ‘এই যে একসাথে আমরা ঘুরছি,সুন্দর সময় কাটাচ্ছি – এই স্মৃতিগুলোই থাকবে। হয়তো কোন এক সময় যোগাযোগ থাকবে না,দেখা হবে না,মিস করবো একজন আরেকজনকে,দেখবে তখন এই সুন্দর স্মৃতিগুলো মনে করলে ভালো লাগবে।’ কিন্তু আসলেই কি তাই ? সব স্মৃতিই কি ভালো লাগায় ডুবিয়ে দেয় ?

আসলে জীবনে চলার পথে কিছু মানুষের সাথে সবারই দেখা হয়ে যায়। সেই মানুষগুলো অদ্ভুত একটা ছাপ রেখে যায় তাদের এমনভাবে যে চাইলেই আপনি ভুলতে পারবেন না তাদের। আর তারা এতটাই অদ্ভুত হয় যে তারা আপনার জীবনের সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে হুট্ করে চলে যায় আপনাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ! আমার এই ছোট্ট জীবনে সে রকমই একটা মানুষের সাথে দেখা হয়েছিলো আমার। অদ্ভুত একটা মানুষ। তাঁকে ভালোবাসতো অগণিত মানুষ। ভুল বললাম ‘ভালোবাসতো’ না তাঁকে এখনো ভালোবাসে অগণিত মানুষ ,বাসবেও চিরকাল। মানুষটাই যে অমন। নিজে যেমন কাঙাল ছিল ভালোবাসার জন্য ,ঠিক তেমনি যাদেরকে তিনি আপন ভেবে কাছে টেনে নিতেন তাদের জন্যও তাঁর ভালোবাসা ছিল অসীম। তিনি আইয়ুব বাচ্চু ,’বস’। আমার ‘বস’, আমাদের ‘বস’,কোটি মানুষের ভালোবাসার ‘বস’।

অদ্ভুত এই মানুষটার প্রতি ভালোবাসা,ভালোলাগার সবটারই শুরু গান দিয়ে। আমাদের স্কুল-কলেজের লাইফে ব্যান্ড শব্দটা ছিল এক ঘোর লাগা উন্মাদনার নাম। এই উন্মাদনার নেশায় আব্বা-আম্মার হাতে মার্ খেয়েছি মেলা। কিন্তু তাতে উন্মাদনা কমেনি কখনো ,বরং বেড়েছে তা সবসময়। এখনকার মতো চাইলেই ইউটিউব বা অনলাইনে সার্চ করে গান শোনার সুযোগ আমাদের ছিল না তখন। বহু কাঠ-খড় পুড়িয়ে ৩৫ টাকা দিয়ে একটা ক্যাসেট কিনে (অনেক সময় ভাগেও কেনা হতো সেই ক্যাসেট ) ,তা বাসায় এনে আব্বা-আম্মার হাতে – পায়ে ধরে হয়তো ১ ঘন্টার অনুমতি মিলতো ক্যাসেট প্লেয়ারে তা শোনার। সেই ১ ঘন্টা তখন আমাদের কাছে ছিল প্রথম প্রেমের প্রথম চিঠি পাবার অনুভূতির মতো ! সে আবেগ,সে ভালোলাগা বোঝাতে পারবো না এই ফেসবুক বা ইউটিউবের যুগে।

যাই হোক ১৯৯২ সালে পল্টন সুপার মার্কেটের দোতালায় জাহাঙ্গীর ইলেক্ট্রনিক্স এ এক বিকেলে গিয়েছিলাম এমনি ঘুরতে। পুরো পল্টন এলাকায় ওই একটাই তখন অডিও ক্যাসেটের দোকান। যেহেতু সবসময় ক্যাসেট কেনার মতো টাকা থাকতো না সেহেতু বিকেলে ওই দোকানের আশেপাশে ঘুরতাম ফ্রি গান শোনার লোভে। যেহেতু অডিও ক্যাসেটের দোকান প্রায় সারাক্ষণই হিন্দি বা বাংলা গান বাজতই। মাগরিবের আজান পর্যন্ত সেই ফ্রি গান শুনে ফিরে আসতাম বাসায়। তো সেরকমই এক বিকেলে গিয়েছিলাম সেই দোকানে। দোতালার সিঁড়ি বেয়ে উঠার সময়ই কানে ভেসে আসলো একটা গান। গানটা হলো ‘ঢাকার সন্ধ্যা’। এই গানের শুরুতে একটা হাসি ছিল -সেটা শুনলেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যেত। খোঁজ নিয়ে জানলাম এটা এল.আর.বি নামের একটা নতুন ব্যান্ডের গান। সেই নতুন ব্যান্ডের প্রথম ডাবল অ্যালবামের সবগুলো গানই এক নতুন নেশার জন্ম দিয়েছিলো তখন। সেই যে ভালোবাসলাম গানের মানুষটাকে তা বুকের ভেতর বহমান এখনও।

আইয়ুব বাচ্চু – এই নামটির সাথে জড়িয়ে আছে কোটি মানুষের ভালোবাসা,শ্রদ্ধা। এই বিশাল মাপের মানুষটির সাথে টানা ২০টি বছর মেশার,তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ভক্ততো তার ছিলামই আগে থেকে কিন্তু সাংবাদিকতা পেশায় আসার পর কর্মসূত্রেই পরিচয়ের শুরু। জানিনা কোন এক অজানা কারণে ‘বস’ আমাকে পরিচয়ের প্রথমদিন থেকেই বেশ পছন্দ করেছিলেন। সময়ের সাথে সাথে সেই পছন্দটা পেশাগত সীমারেখার বাইরে যেয়ে হয়ে উঠেছিলো পুরোপুরিই আত্মিক। আসলে সেই সম্পর্কের নামটা যে কি তাই বলা কঠিন আমার জন্য।

সময় যতো গড়িয়েছে আমার প্রতি বসের ভালোবাসা ,বসের প্রতি আমার ভালোবাসা,শ্রদ্ধা চক্রাকারে বেড়েই চলেছে। বস কোন এক কারণে আমাকে শুরু থেকেই খুব আদর করতেন। আমি আজও জানিনা সেই কারণটা কি। আমার এই ছোট্ট জীবনে কি নাই তার সাথে ?রাগ,অভিমান,সুখ,দুঃখ ,ভালোবাসা কত কত স্মৃতি। প্রায় ২০টা বছর এই মানুষটা আমাকে আগলে রেখেছিলেন সন্তানের মমতায় ,ছোট ভাইর ভালোবাসায়। শেষের দিকে একটু কথা কম হতো বসের সাথে। তবে দেখা হতো নানা অনুষ্ঠানে। দেখা হলেই বা কথা হলেই প্রথমেই বলতেন ‘কি রে ভুলেই তো গেলি?’ আমি বলতাম ‘কি যে বলেন বস ? আপনারে ভুলবো আমি ?’ বস দেখেন আমি আপনাকে ভুলি নাই। কিন্তু আপনি আমাকে ভুলে চলে গেলেন। বস আমি এখন কাকে বলবো ‘বস একটু কথা আছে ,একটা ঝামেলা হইসে। আপনি আছেন কিচেনে ?’ কে আমাকে বলবে ‘আয়,আছি আমি।’ এই স্মৃতি আমাকে কোন ভালোলাগায় ভাসাবে ? এর জবাব বা উত্তর কোনোটাই আমার কাছে নেই ,জানাও নেই।

এই যে আপনার চলে যাওয়ার একটা বছর হয়ে গেলো। আপনাকে হারানোর হাহাকার ,ব্যথা,কষ্ট কোনটাইতো কমেছে না আমাদের। এখনো মন খারাপ হলে আপনার গান শুনি ,মন ভালো থাকলেও আপনার গান শুনি। বন্ধু,সহকর্মীদের আড্ডায় অবধারিতভাবে আপনার গল্প উঠে আসে। মুহূর্তেই তখন দেখি খানিক আগের হাসিখুশি মানুষগুলোর মুখে বিষন্নতা,কষ্টর ছাপ। চোখের কোণে জলের আভাস।

আপনি এমন এক মানুষ যে কিনা চলে যেয়েও হৃদয়ের রাজ্যের ‘বস’ হয়ে বসে আছেন। আমি,আমরা সেই ‘বস’কে ভালোবাসি ,ভালোবাসবো আজীবন। এক বছর না ,দশ বছর না ,যুগ যুগ ধরে আপনিই থাকবেন আমাদের হৃদয়ের রাজ্যের ‘বস’ হয়ে। ভালো থাকুন ‘বস’। ওপার থেকে ভালবাসা দিয়েন আমাদেরও।